প্রবন্ধ     «Newspaper»   «Home»   «Map&Rev»

 

সভাপতির -পতিত্ব বিচার

বেশ কিছুদিন ধরেই কেউ কেউ, মানে একপক্ষ বলছেন, সভাপতি বলা যাবে না। কারণ সভাপতি শব্দটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয় কিংবা উভলিঙ্গার্থকও নয় (সংস্কৃত এবং সে থেকে বাংলার ক্লীব লিঙ্গের কথা বাদ দিয়েই)। অর্থাৎ মহিলারা যদি সভা পরিচালনায় থাকেন তবে তারা পতি হতে পারেন না। ওদিকে পতির লিঙ্গান্তর পত্নী ধরে সভাপত্নী করা বাংলা গদ্যের শুরুর দিকে হয়তো যেত, এখন কেমন যেন বাধো-বাধো ঠেকে, বিশেষত বাংলা গদ্যের এত দূর গড়িয়ে আসা আর রাজনৈতিক দুরস্তির এতটা পথ পেরুনোর পর। বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যে পাওয়া যায়: ‘পাড়ার যমুনাঠাকুরাণী সভাপত্নী হইয়া জমকাইয়া বসিয়া আছেন।’ যে জমানায় যে রকম দস্তুর। এখন অনেকেই সভানেত্রী শব্দটির ব্যবহার করেন, তবে অনেকেই আবার মানতে চান না। কারণ সভার সভানেত্রীর চেয়ে দলের সভানেত্রীই বেশি মানানসই। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, সভানেত্রীর পুরুষ লিঙ্গান্তর সভানেতা না হয়ে সভাপতি কিংবা সভাপতির স্ত্রী লিঙ্গান্তর সভাপত্নী না হয়ে সভানেত্রী ঠিক যুতসই নয়। কারণ তারা দেখতে এক রকম নয়, যেমনটি ধোপানি-ধোপা কিংবা শিক্ষিকা/শিক্ষয়িত্রী-শিক্ষক। প্রথম ক্ষেত্রে ধোপা যদিও ধোপানির স্বামী (ধোপার কাজে সাহায্য করে বলে ধোপানির ওপর হয়তো কিছুটা হলেও ধোপাত্ব বর্তায়), দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শিক্ষক একজন বা অনেকজন শিক্ষিকার সহকর্মী মাত্র; বৈবাহিক সম্পর্কটা জরুরি নয়; কিন্তু সম্পর্কটা যদি থেকেই থাকে, তবে অন্য ধরনের লিঙ্গান্তরে একজন হলো শিক্ষক-পত্নী আর অন্যজন শিক্ষিকার স্বামী, অন্য সংজ্ঞায় গুরুপত্নী বা গুরুপতি।

যাই হোক, বাংলা ভাষায় পতি-অন্ত্য শব্দের সংখ্যা কম-বেশি কুড়ি পাঁচেকের মতো। অধিপতি, আশাপতি, উমাপতি, ঋতুপতি, কুলপতি, কোটিপতি, ক্ষিতিপতি, খগপতি, গজপতি, গৃহপতি, গোষ্ঠীপতি, ছত্রপতি, জগৎপতি, জম্পতি, টঙ্কপতি, তারাপতি, দলপতি, দেবপতি, ধনপতি, নরপতি, নৃপতি, পৃথ্বীপতি, বাকপতি, বিচারপতি, ভগ্নিপতি, ভূপতি, মহীপতি, যুথপতি, রতিপতি, রাষ্ট্রপতি, লক্ষপতি, শচিপতি, সতীপতি, সভাপতি, সমাজপতি, সীতাপতি, সুরপতি, সেনাপতি ইত্যাদি। এর সবই তৎসম শব্দ। অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত শব্দ। তবে সংস্কৃত ভাষায় পতি-অন্ত্য শব্দ বাংলার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এখন প্রশ্ন — এই সব শব্দতেই কি পতির অর্থ পুরুষবাচক, বৈবাহিক সূত্রে নারীর স্বামী, যার কারণে সভাপতি, রাষ্ট্রপতি কিংবা বিচারপতি শব্দগুলোর ব্যবহারে আপত্তি? গোটা কয়েক সংস্কৃত অভিধান ঘাঁটা যাক।

বামন শিবরাম আপ্টের সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধানে পতির (পতিঃ) অর্থ কর্তা (a master, lord, যেমন গৃহপতিঃ); অধিকারী, স্বত্বাধিকারী (an owner, possessor, proprietor, যেমন ক্ষেত্রপতিঃ) শাসক (governor, ruler, one who presides over, যেমন ওষধীপতিঃ, বনস্পতিঃ, কুলপতিঃ); স্বামী (a husband); গোড়া (a root); যাওয়া, গতি, উড়ান (going, motion, flight); শব্দটির স্ত্রীবাচক অর্থ অধিকারিণী, কর্ত্রী (a female possessor, a mistress); আর স্ত্রী (a wife)। ওটো ফন ব্যোটলিংকের জর্মনে-লেখা সংস্কৃত-শব্দকোষে পুরুষবাচক অধিকারী, প্রভু; স্বামী এবং স্বামী-কিংবা-স্ত্রী (জর্মনে Gemahl এবং Gatte যার অর্থ ইংরেজিতে spouse); মূল; স্ত্রীবাচকে অর্থ অধিকারিণী এবং শাসক; আর স্ত্রী এবং স্ত্রী-কিংবা-স্বামী (জর্মনে Gattin, যা ইংরেজিতে wife কিংবা spouse)। স্যার মনিয়ের মনিয়ের-উইলিয়ামসের সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধানে অর্থ প্রভু, মালিক, স্বত্বাধিকারী, শাসক, পরিচালক, যে অধিষ্ঠিত হয় এমন (a master, owner, possessor, proprietor, lord, ruler, governor, sovereign, one who presides over); স্বামী (a husband); শিকড় (a root); গমন, গতি, উড়ান (going, motion, flight); অধিকারিণী, কর্ত্রী (a female possessor, mistress যেমন গ্রামস্যপতিঃ, অর্থাৎ গ্রামের কর্ত্রী); স্ত্রী (a wife যেমন বৃদ্ধপতি, বৃদ্ধলোকের স্ত্রী বা বৃদ্ধপত্নী)। প্রথম অভিধানটি ১৮৯০ সালের, দ্বিতীয়টি ১৮৭৯ সালের আর তৃতীয়টি ১৮৭২ সালের। প্রতিটি অভিধানেই শুরুর দিকের অর্থ কর্তা, মালিক বা অধিকারী; মাঝের দিকের অর্থ স্বামী; আর শেষের দিকের অর্থ স্ত্রী।

পাণিনি-পূর্ব ব্যাকরণবিদ যাস্কের মতে, পতি শব্দের উৎপত্তি পা বা পাল্ ধাতু থেকে, যার অর্থ রক্ষা করা; আর সে কারণেই সংস্কৃত মায় বাংলার অভিধানেও ব্যুৎপত্তিটা একই। এমনকি বাংলা অভিধানেও অর্থক্রমটা প্রায় একই ধরনের। জ্ঞানেন্দ্রমোহনের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে পতির অর্থ রক্ষাকর্তা বা রক্ষক, ভর্তা বা পালক, প্রভু বা স্বামী, এবং নেতা, অধ্যক্ষ কিংবা নায়ক। হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষে পালক, রক্ষক; অধিপতি, প্রভু, নায়ক; অধিকারী, স্বামী; প্রধান, অধ্যক্ষ, শ্রেষ্ঠ; শাসক; ভর্তা, স্বামী, বর; গতি; এবং স্ত্রীবাচক অর্থে স্বামিনী, কর্ত্রী। ভাবগতিকে বেশ বোঝা যায়, পতি শব্দের অর্থসংকোচন বা অর্থবিকারে গৃহের রক্ষক থেকে বৈবাহিক সম্পর্কে স্বামী হয়েছে; বৈবাহিক সূত্রের প্রয়োজনটা পড়েছে, কারণ স্বামীর একটি অর্থ অধিকারী; গৃহস্বামী বলতে গৃহের রক্ষক বোঝায়, আজ অবধি। সংস্কৃতে দম্পতি (এক বচনে) বলতে গৃহের কর্তা (lord of the house) বোঝায়; আবার দম্পতী (দ্বিবচনে) বৈবাহিক সূত্রে স্বামী-স্ত্রী বোঝায়—স্বামী এবং স্ত্রী মিলেই গৃহের কর্তা-কর্ত্রী; স্বামী একা নয়। ইংরেজিতেও স্বামীর ক্ষেত্রে ঘটনাটা একই রকম অর্থসংকোচনের: আধুনিক ইংরেজিতে husband, মধ্যযুগের ইংরেজিতে huseband, পুরনো ইংরেজিতে hūsbōnda, পুরনো নর্সে hūsbōndi — hūs মানে গৃহ আর bōndi বা būandi, būa ক্রিয়াপদ থেকে, মানে বাস করছে এমন কেউ। অর্থাৎ গৃহের অধিকারী বা রক্ষক (a householder)। এই husband থেকে ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে, husbandman, অর্থ যে চাষ করে বা কৃষক, অর্থাৎ the holder of a husbandland বা manorial tenancy। শব্দের অর্থসংকোচন, অর্থসম্প্রসারণ বা অর্থবিকার যুগে যুগে ঘটে থাকে। বাংলায়ও ঘটেছে; কিন্তু শব্দ-বর্জনের কারণ তাতে ঘটে না। বাংলা অভিধানমতে, বৈবাহিক সূত্রে স্বামী পুরুষবাচক হলেও বাকি অর্থে ততটা পুরুষবাচক নয়; কর্তা বা অধিকারী অর্থে তো নয়ই।

অন্যদিকে মনিয়ের-উইলিয়ামসের অভিধানই বলছে সভাপতি শব্দে পতির অর্থ কর্মকর্তা, সভা চালিয়ে নেওয়ার অর্থে। জ্ঞানেন্দ্রমোহনে সভানায়ক বা সভার কর্মকর্তা। মনিয়ের-উইলিয়ামসের অভিধানটি আরেকটু আলোকপাত করছে এ ব্যাপারে। ভুক্তির শুরুতে বলা আছে যে অযৌগ এবং স্বামী অর্থে পতি শব্দের প্রকরণ করণকারকে পত্যা, সম্প্রদান কারকে পত্যে, সম্বন্ধ এবং অপাদানে পত্যুর্  ও অধিকরণে পত্যৌ; কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে শব্দটির প্রকরণ দস্তুরমাফিক হবে। সভাপতির ক্ষেত্রে করণে সভাপতিনা, সম্প্রদানে সভাপতয়ে, সম্বন্ধ ও অপাদানে সভাপতেঃ, এবং অধিকরণে সভাপতৌ। রাষ্ট্রপতি এবং বিচারপতির ক্ষেত্রেও তাই; আদতে যৌগ শব্দে পতির অর্থ কর্তা বা প্রভু বোঝালেই প্রকরণের এই নিয়ম। এ থেকে বোঝা যায়, বৈবাহিক স্বামী অর্থে পতি ও রক্ষক অর্থে পতি একেবারে আলাদা এবং এতটাই আলাদা যে ব্যাকরণে তার প্রকরণের নিয়মও আলাদা। হরিচরণেও পতি অর্থে অধিকারিণী/অধিকারী কিংবা স্বামিনী/স্বামী থেকে বোঝা যায় শব্দটি অন্তত এই অর্থে আদিতে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ বা উভলিঙ্গার্থক ছিল; এর লিঙ্গবোধের জন্য দায়ী পরের সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা। তাই বিচার হলে সমাজেরই হওয়া উচিত, পুরুষতান্ত্রিকতারই হওয়া উচিত। সভাপতি, রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি কিংবা বিচারপতির নয়; পতির তো নয়ই; বাস্তবে পতি-অন্ত্য বেশিরভাগ শব্দেরই নয়।

শীলা দাগে, ডাগেও হতে পারে, ‘ঋগ্বেদে “পতি” শব্দের বাগর্থ-বিচার’ নামে একটি লেখায় (পিয়ের-সিলভ্যাঁ ফিলিওজা এবং অন্যান্য সম্পাদিত পণ্ডিত নিড্ডোডি রামচন্দ্র ভট্ট সম্মাননা গ্রন্থ, মোতিলাল বানারসিদাস, দিল্লি: ১৯৯৪, পৃ. ৫১) বলেছে যে রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি, সভাপতি প্রভৃতি শব্দে পতির আদি অর্থ এখনও বিদ্যমান। এই লেখাতেই আছে যে পতি শব্দটির ব্যবহার ঋগ্বেদে ছয়শ’ বার, কিন্তু এর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বোঝায় মাত্র আটান্নটা ক্ষেত্রে। এই লেখা (সঙ্গে উদাহরণ) মোতাবেক পতি শব্দটি ঋগ্বেদে রূপকার্থেও রক্ষক, অভিভাবক, পথপ্রদর্শক, নিয়ন্ত্রক এমনকি উৎসাহ প্রদানকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সংস্কৃতে তো বটেই, বাংলায়ও সব ধরনের অর্থ বাদ দিয়ে বৈবাহিকতা ও পুরুষবাচকতার ছাপিয়ে ওঠাটা শব্দের অর্থজ্ঞাপনের দৈন্যের চেয়ে সমাজের সদস্যদের, সবার না হোক কারুর কিংবা কারুর-কারুর তো দেখার বা বোঝার দৈন্যেরই প্রকাশ।

ওদিকে আবার নাকি শোর উঠেছে মহিলা শব্দের অশ্লীলতা নিয়ে এবং সেই অশ্লীলতার কারণে শব্দটির ব্যবহারের যথার্থতা নিয়ে। মহিলা শব্দটি অশ্লীল, কারণ এর উৎপত্তি মহল থেকে। কথা উঠছে রাজনৈতিক দলগুলোর মহিলা সংগঠনের নাম নিয়ে। কথা হয়তো উঠবে মহিলা বিষয়ক সরকারি-বেসরকারি কাজকর্মের নাম নিয়ে; কাজকর্ম নিয়ে নয়। এসব ক্ষেত্রে নারী শব্দটিই নাকি দস্তুর। কিন্তু এ ব্যাপারে গোড়ার প্রশ্নটি হলো, যারা এহেন শব্দব্যুৎপত্তির কথা বলছেন তাদের এই ব্রহ্মজ্ঞানের উৎস কী? সম্ভবত একটি কবিতা। সম্ভবত কারণ, যারা যুক্তিটি তুলে ধরছেন তারা কেউই কবিতাটির কথা সরাসরি বলছেন না। বলছেন আড়ে-ঠারে। ‘ঘোড়াশালে ঘোড়া হাতিশালে হাতির মতো মহলে মহলে থাকো/ তাই তোমার নাম মহিলা’ — এই সেই কবিতা-পঙ্ক্তি। কবিতার নাম — কর্তৃত্ব গ্রহণ কর, নারী; কবির নাম — ফরহাদ মজহার। ছোট হোক বা বড়, কবিদের কল্পনাশক্তি অসীম। কারণ সেটাই তাদের ব্যবসা; তাকে সীমিত করার দায় কবির নিজের না থাকলে আর কারুরই নেই। কিন্তু কেউ কেউ কবির কথা বেদবাক্য বলে মেনে আর সবাইকে মানানোর চেষ্টা করবেন সেটা মানা বড় কঠিন।

ভারতবর্ষে ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে কোনো এক গ্রীষ্মকালে ঝড়ের সময় গাছ থেকে কি একটা পড়ছিল, আর লোকে পড়ি-মরি দৌড়াচ্ছিল সেগুলো কুড়ানোর জন্য। এ দেখে কি হচ্ছে এ ব্যাপারে এক ইংরেজ এক দেশীয়কে জিজ্ঞাসা করলে নাকি উত্তরটি ছিল ম্যান গো (man go); ইংরেজের প্রশ্ন ছিল গাছ থেকে কি পড়ছে? আর এদেশীয় ব্যক্তির উত্তর ছিল কে দৌড়াচ্ছে। এ থেকেই নাকি আমের ইংরেজি হয়েছিল ম্যাঙ্গো (mango)। লোকব্যুৎপত্তির মতো শুনতে, আদতে গল্প, বেশ চটকদার। কিন্তু এতে আসল কথাটা পাল্টায় না। ১৫৮০’র দশকে ইংরেজি ভাষায় চালু হওয়া mango শব্দের কথা — তামিল মান (আমগাছ) আর কয় (ফল) মিলে মালয় মাঙঙা হয়ে পর্তুগিজ মাঙ্গার বিলেতি ম্যাঙ্গো হয়ে ওঠা। ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে তার মানে হলো, লোকব্যুৎপত্তি শব্দের নিরুক্তি সন্ধানে কাজের কিছু নয়, অন্তত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। আরবি মহল — মিম-হা (আল-আবজাদিয়াহ আল-আরাবিয়াহ অর্থাৎ আরবি বর্ণমালার ষষ্ঠ হরফ)-লাম (সঙ্গে ব্যঞ্জনের দ্বিত্বজ্ঞাপক চিহ্ন শাদ্দা) — অর্থ স্থান, মোকাম, ভাঁড়ার, দোকান, বাসস্থান, সমাবেশ ইত্যাদি; ফারসিতে স্থান বা বাসস্থান; এই মহল এসেছে তিন-হরফি মূল হা (ষষ্ঠ হরফ)-লাম-লাম থেকে, জায়গা অর্থে। আর উর্দুতে (হিন্দিতেও, ফারসির বরাতে) প্রাসাদ বা মহিলাদের থাকার জায়গা যেমন জেনানা মহল, অন্দরমহল অর্থে। অথচ বাংলার মহিলা শব্দটি সংস্কৃত থেকে আসা, বাংলা এবং সংস্কৃতর সব অভিধান মিলিয়ে। সংস্কৃতে এর প্রথম অর্থ স্ত্রী, নারী; আর দ্বিতীয় অর্থ নারীই, তবে মদ-মত্ত। বাংলায় অর্থটি খানিকটা পাল্টেছে — ভদ্র রমণী বা ভদ্র নারী, যেমন শ্বেতাঙ্গী মহিলা, এবং গৃহিণী, যেমন জজ-গৃহিণী। এদিকে বাংলায় মহিলা-মহলের দুই অর্থ: জেনানা বা অন্দরমহল এবং মহিলা-সমাজ।

নারী শব্দের ব্যবহার আছে, থাকবে, যেমনটা থাকবে মহিলা শব্দের ব্যবহার। জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানে বিজয় চন্দ্র মজুমদারের লেখা থেকে উদ্ধৃতি: ‘বেদের ভাষার মধ্যে যাহা প্রাচীনতম সেই ভাষায় স্ত্রীজাতির সাধারণ নাম ছিল “নারী”; এই নারী শব্দ “নর” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গের রূপ নহে। নর শব্দটি সুপ্রাচীন বেদ-সংহিতায় প্রচলিত নাই। যে যুগে নর শব্দ ছিল না, কিন্তু নৃ শব্দ ছিল, সেই যুগেই স্ত্রীজাতি বুঝাইবার জন্য নারী শব্দের যথেষ্ট প্রচলন ছিল এবং নারী শব্দের অর্থ ছিল নেত্রী ** পারিবারিক বিষয়ের নেত্রী; তিনি ভোগ-বিলাসের রমণী বা কামিনী ছিলেন না।’ সংস্কৃত অভিধানও বলে নৃ, মানে পুরুষ বা ব্যক্তি, থেকে নর; সে থেকে নার, বিশেষণে অর্থ পুরুষ, মানুষ বা মানব সম্পর্কিত আর বিশেষ্যে পুরুষ বা মানুষ; সে থেকে নারী, অর্থ স্ত্রী বা ভার্যা কিংবা নারী বা নারীসুলভ যে কোনো কিছু। তবে বাংলায় নারী শব্দে নারীত্ব, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সেই সঙ্গে কমনীয়তা এবং রহস্যময়তা, যতটা উদ্ভাসিত হয়, মহিলা শব্দে ততটা নয়; মহিলা সমাজমুখী, স্বাতন্ত্র্যের ঊর্ধ্বে। তারপরও ক্ষেত্রবিশেষে মহিলা ক্ষেত্রবিশেষে নারীর ব্যবহার হতে থাকবে। হরেদরে না হোক, মুসলমান বাঙালির মুখে জল পানি হয়ে ওঠে বলে জলবায়ু তো পানিবায়ু হয়ে যায়নি; আবহাওয়া বলে একটা ব্যাপার হয়, কিন্তু সে জলবায়ু থেকে আলাদা।

ভাষার গতি অনাদিকাল থেকে পরিকল্পনা-বিরোধী। সস্যুর-দেরিদার কচকচানিতে না গিয়েও একটা বোধ হয় যে আলোচনা করে ভাষার মতো একটি বিশাল ব্যবস্থায় নতুন কিছুর সংযোজন বা পুরনো কিছুর বিয়োজন কার্যত অসম্ভব। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাই সেই ভাষাগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট। তাতে অন্য সমাজের সাপেক্ষে যদি দুর্বলতা থাকে, লিঙ্গ-সমতার অভাব থাকে, পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব থাকে, রাজনৈতিক যাথার্থ্যের গর-হুজুরি থাকে, শ্রেণিবৈষম্য থাকে, তবে তার কারণ সমাজটিতে লিঙ্গ-বিষমতা, পুরুষতান্ত্রিকতা এবং শ্রেণি-বিষমতা আছে; সমাজের লিঙ্গের বিষমতা, পুরুষতান্ত্রিকতা এবং শ্রেণির বিষমতা দূর না করে সেগুলো ভাষায় দূর করলে লাভ নেই; ভাষা সমাজের অনুগামী, সমাজ ভাষার নয়।

 

আবু জার মোঃ আককাস। (১৯শে আগস্ট ২০১৬)। সভাপতির -পতিত্ব বিচার। কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল। পৃ ২০–২১ পত্রিকায় ‘কিছু শব্দ নিয়ে তর্ক’ শিরনামায় ছাপা হয়েছে, ছাপার ভুলের সংশোধন-সহ।

 

Rev.: vii·xi·mmxxii