বানান বিতর্ক     «Newspaper»   «Home»   «Map&Rev»

 

ইদ-ঈদের বিতর্ক

স্পষ্ট মনে পড়ে ছোটবেলায় বাড়ী লিখতাম, গাড়ী লিখতাম; কবে যেন সেগুলো বাড়ি এবং গাড়ি হয়ে গেছে, অজান্তেই। হয়েছে অনেক আগেই; তবে সেটা আবারও মনে পড়ল ইদ-ঈদের পক্ষ-বিপক্ষের ঝগড়ায়। অনেকের ধারণা বাংলা একাডেমি ঈদকে ইদ হিসেবে বর্ণনার প্রস্তাব করছে বা বানানটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। (২০১৩-র শেষের দিকে বাংলা একাডেমী তার লেজের দীর্ঘত্ব নিজের নিয়ম মেনে ছেঁটে ফেলে একাডেমি করলেও, অন্য এক নিয়ম মেনে গোড়ার গলদ শুধরে এ পালটে অ্যাকাডেমি করে উঠতে পারেনি।) এবং সে কারণে তুমুল হাততালিসহ বাংলা একাডেমিকে এক হাত (পারলে দু’হাতই) দেখে নেয়া হচ্ছে।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে (সেও ছাপা হয়েছে ২০১৬-র ফেব্রুয়ারিতে), ঈদের ভুক্তিতে বলেছে প্রচলিত কিন্তু অসংগত বানান আর ইদের ভুক্তিতে বলেছে সংগততর কিন্তু অপ্রচলিত বানান। বাংলা একাডেমির সাথে আমার বনে না; বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের সাথে তো নয়ই। তবে এবারে যারা বাংলা একাডেমিকে এ বাবদে এক হাত দেখে নেবার চেষ্টা করছে, হইহই করছে এবং হইচই করছে (কতটা পারছে তা বোঝা যাচ্ছে না এখনও) তাদের সাথে একেবারেই বনছে না। বাঙালির চামড়া যে গণ্ডারের, সেটা আরও একবার প্রমাণ করে, দেড় বছর পরে হঠাত্ এত হই-চই কেন, তার কারণটাও বোঝা গেল না। হতে পারে বাঙালিরা সাধারণত অভিধান দেখে না; বা দেখলেও, দেড় বছর পরে দেখে।

ভাষা যেহেতু আইনের শাসন মানে না (ভাষা নিজে তা মানতে চাইলে বা অন্য কেউ তাকে আইনি শাসন মানাতে চাইলে সে-ভাষার আম ব্যবহারকারীদের প্রথম কর্তব্য প্রতিবাদে রাস্তায় নামা), তাই বাংলা একাডেমি কিছু বললেই তা শুনছে কে? তবে বাংলা একাডেমি ঈদ বা ইদ কোনওটাকেই শুদ্ধ বা অশুদ্ধ বলেনি। বরং বলেছে একটি প্রচলিত এবং অন্যটি অপ্রচলিত— সর্বৈব সত্যি কথা। অভিধানের এইটিই তো কাজ— একটা ছকে ফেলে সমাজে শব্দের ব্যবহারের ধরনটা তুলে ধরা। ধরনও পালটে যায়; আর তখন অভিধানও পালটায়। বাড়তি হিসেবে বলা হয়েছে— প্রচলিত বানানটি অসংগত এবং অপ্রচলিত বানানটি সংগততর।

অসংগত বা সংগততর কেন? বাংলা একাডেমির বানানের রীতিতে (বানানের অপরাপর এবং অনেক পুরানো রীতিতেও) অতৎসম অর্থাত্ তদ্ভব, দেশি বা বিদেশি শব্দে কেবল (হ্রস্ব) ই এবং (হ্রস্ব) উ ব্যবহার করা দস্তুর। ১৯৯২ থেকেই এরকমটি বলা হয়ে আসছে বাংলাদেশে। এ কারণেই একটি বানান অসংগত এবং অন্যটি সংগততর। এও সর্বৈব সত্যি।

এ নিয়মের প্রতিফলন আছে বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে, বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধানে, বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে কিংবা বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে। ১৯৭৩ সালে ঢাকা থেকে ছাপানো সোনার বাংলা অভিধানেও এ নিয়মের দেখা মেলে: হ্রস্ব ই দিয়ে ইদ নেই, কিন্তু ইদগাহ আছে।

বাংলা একাডেমি বানান রীতির শুরুর দিকে যে বিকল্প রেখে দিয়েছিল, সেটিই বরং বানানের সমতা বিধানে অনেক দেরির কারণ। অনেকে ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্ভরতার দোহাই তুলে একাডেমিকে তুলোধুনো করছে। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে যে ফরাসি ও রুশ ভাষার হাজার-হাজার বানান পরিবর্তন করা হয়েছিল। দাদার ঈদ লেখার কারণে যদি নাতনি-নাতিকেও ঈদ লিখতে হয়, তবে তো এখন বিশেষতঃ, চলচ্চিত্র লিখতে হয়। কারণ বেশির ভাগ বাঙালির দাদি-দাদারা তাই লিখত। যদিও বিশেষত বা চলচিত্র লেখাটাই আধুনিকতা। পৃথিবীর সমস্ত বাঙালির দৃষ্ট এবং শ্রুত ঐতিহ্যের চেয়ে না-দেখা, না-শোনার ইতিহাসটাই বেশি; সেটা মেনে তো তাহলে যাওয়াকে জাওয়া লিখতে হয়, অনেক আগে, বেশ কয়েক হালি দাদার-দাদার আগের সময়ে যেমনটি হত।

বাংলায় বিদেশি শব্দে দীর্ঘ স্বরের ব্যবহার না করবার কারণ হল, বাংলা উচ্চারণে স্বরের দীর্ঘত্ব বা হ্রস্বত্বের ধ্বনিমূলক অস্তিত্ব নেই। ইদ বা ঈদ আরবি শব্দ: আইন-ইয়া-দাল। আরবিতে অবশ্যই স্বরটি দীর্ঘ; কিন্তু তার বাংলায় দীর্ঘ থাকাটা কতটা জরুরি (ফারসিতে জরুরির শেষের স্বরটা দীর্ঘ হলেও বাংলায় এখন তা হ্রস্ব)। ইদ এবং ঈদ কাগজে লিখে অন্য কারুকে পড়ে শোনালে কি না জেনে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব কোনটা হ্রস্ব আর কোনটা দীর্ঘ? ঈদ কেউ টেনে পড়ে না?

তাছাড়া অন্য ভাষায় স্বরের হ্রস্বত্ব এবং দীর্ঘত্ব নিয়ে মাতামাতি করে কি লাভ যখন অন্য ভাষার শব্দের ব্যঞ্জনের চরিত্র বজায় রাখা সম্ভব হয়নি— কি বুলিতে, কি হরফে? আরবিতে ঈদ শব্দের প্রথম ধ্বনিটি একটি ব্যঞ্জনধ্বনি, অথচ বাংলায় স্বরধ্বনি দিয়ে লেখা হয়। আরবিতে যথেষ্ট দড় না হলে আম বাঙালির বুলিতে ধ্বনিটি গরহাজির। আর বাংলার হরফে তো তা লেখাই দুষ্কর। আন্তর্জাতিক ধ্বনিতাত্ত্বিক বর্ণমালার হরফে এটির বাহারি নাম গলবিলীভূত স্বররন্ধ্রীয় অঘোষ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনি। অনেক সাধ্য-সাধনায় বাঙালির জিহ্বায় প্রাণ পায়। প্রায় শ’খানেক বছরের কিছু কম সময় ধরে বাংলায় এটি লেখবার একটা নিয়ম অবশ্য আছে— ই বা ঈ-এর নিচে একটি ফুটকির ব্যবহার। সেটা কজনেই বা জানে আর কজনেই বা মানে? জানলেও কি মানা সম্ভব?

আরবির অনেক ব্যঞ্জনধ্বনি বাঙালির জিহ্বায় সহজে ফোটে না, হরফেও আসে না। হক বা নাহক বাঙালির বুলিতে এবং মুসলমানদের নামে বেশ প্রচলিত শব্দ। আরবি যে হা (উর্দুতে বড়ী হে) বা কাফ (উর্দুতে বড়ী কাফ) দিয়ে বানানগুলি লেখা হয় তা বাংলায় লেখা সম্ভব নয়, তার কারণ আরবির তুলনায় বাংলার ধ্বনি-নির্দেশক হরফের স্বল্পতা। আরবিতে দুই হা, অথচ বাংলায় একটি; আরবিতে দুই কাফ, অথচ বাংলায় এক; আরবির চার স বা শ, অথচ বাংলায় উচ্চারণে দুই এবং লেখায় তিন।

অনেক আগে সাধারণভাবে আরবির এই হ বা ক লিখতে ব-ফলার ব্যবহার হতো। কেউই তো হ্বক্ব বা নাহ্বক্ব লেখে না; আর উচ্চারণ তো সেভাবে করেই না। বাংলা তার নিজের ঝুলির হরফ দিয়ে বিদেশি শব্দকে সাজিয়ে নেবে, নিজের ধ্বনি দিয়ে তার প্রকাশ ঘটাবে সেটাই স্বাভাবিক। আরবির আমাল (আইন-মিম-লাম) বাংলায় আমল কিংবা গালাত (গাইন-লাম-তোয়া) হল গলদ অথবা আরবির রাকাম (রা-দ্বিতীয় কাফ-মিম) বাংলায় রকম। আরবির ধ্বনিশুদ্ধতা বাংলায় রক্ষা করা যায়নি। এসব ক্ষেত্রে অতিশুদ্ধতার দোহাই টেকে না একেবারেই।

ভাষা আদতে শব্দের ব্যাপার, বিশেষত মুখের বুলিতে। ভাষা আগে এসেছে, লেখ্য রীতি পরে। সে কারণেই লেখ্য রূপ ছাড়া অনেক ভাষা আছে। স্বাভাবিক প্রয়োজনে লেখ্য রূপ পালটালে ভাষার পরিবর্তন হয় না। অনেক ভাষাই আবার তাদের লেখার হরফ পালটেছে। এতে তার কোনও শব্দের অর্থের দ্যোতনা বদলে যায়নি। বাংলারও যাবে না। বাংলায় সহির পরিবর্তে ছহীহ লেখা তো ঐতিহাসিকভাবে সত্য; কিন্তু আধুনিক নিয়ম মেনে সহি লিখলে শুদ্ধতার কোনও খামতি পড়ে না। আর সেভাবে দেখতে গেলে তো চর্যাপদের বানানে আমাদের বাংলা লিখতে হয়। সেটা কি পশ্চাত্পদতার একটি নিদর্শন হয়ে উঠবে না? নিদেনপক্ষে আমরা কি আবার গাড়ী, বাড়ী, পাখী ইত্যাদিতে ফিরে যাব?

অভিধান যখন বলে যে একটি শব্দ সংগততর কিন্তু অপ্রচলিত তখন তার অর্থ কোনওভাবে এটা দাঁড়ায় না যে এটি শুদ্ধ এবং তা ব্যবহার করতে হবে। আবার অভিধান যখন বলে যে একটি শব্দ অসংগত কিন্তু প্রচলিত, তার অর্থও এটা নয় যে এটি অশুদ্ধ এবং তা বর্জন করতে হবে। যার যা ইচ্ছে গ্রহণ বা বর্জন করতে পারে। কিন্তু প্রথাগতভাবে শিক্ষায়তনে একটি নিয়মে সবাইকে চলতে হয় নাহলে কাজ এগোয় না। ভাষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাষ্ট্র এ কাজটি করে। এ কারণেই পাঠ্যপুস্তক বোর্ড গেল শতকের আশির দশকের শেষ দিক থেকে এ কাজটি করে আসছে। সে কারণে পাখী এখন পাখি কিংবা শ্রেণী হয়েছে শ্রেণি (দ্বিতীয়টা যদিও অন্য কারণে)। বানান সংস্কার তৈরি-হওয়া পরিণত মনের জন্য নয়; বরং মন তৈরি করবার জন্য। পরিণত মনের বাঙালিরা যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, নতুনভাবে তৈরি-হওয়া মনের বাঙালিরা তখন সংস্কারকৃত বানানে লিখবে।

শোনা যায় ব্রিটেন যখন ১৭৫২-র সেপ্টেম্বরে জুলিয়ান দিনপঞ্জী থেকে ১৫৮২-তে সংস্কৃত গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জী গ্রহণ করে তখন নাকি রাস্তায় রব উঠেছিল— ‘আমাদের ১১ দিন ফিরিয়ে দাও’। এগার দিনের হিসেবের গরমিল মেটাতে ২রা সেপ্টেম্বরের পরের দিনকে ১৪ই সেপ্টেম্বর ধরা হয়েছিল। অঙ্কটা একটু পালটেছিল, কিন্তু আগের দিনের ঠিক পরেই পরের দিনটি এসেছিল। ব্রিটেনবাসীদের দিনের কোনও ঘাটতি পড়েনি।

 

আবু জার মোঃ আককাস। (২৫শে জুন ২০১৭)। ইদ-ঈদের বিতর্ক। বণিকবার্তা।

 

Rev.: vii·xi·mmxxii