Review     «Newspaper»   «Home»   «Map&Rev»

 

‘আধুনিক’ অভিধানের আধুনিকতা

আধুনিক শব্দটি সবসময় আধুনিক, রাজশেখর বসু মানে পরশুরামের আমলে যতটা, হাল জমানায় ঠিক ততটাই। সে কারণে বোধ করি চলন্তিকার অপর-আখ্যা হল ‘আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান’ আর বাংলা একাডেমির (অ্যাকাডেমি লেখাই দস্তুর) সাম্প্রতিকতম অভিধানের নাম ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’। নামকরণের সাযুজ্যটা নেহাতই আপাতত কাকতালীয় । আলোচনা আদতে আধুনিক বাংলা অভিধান নিয়ে; চৌদ্দশ’ চৌত্রিশ পৃষ্ঠা; গায়ের দাম চারশ’ টাকা, যদিও বিক্রি হয় দুশ’ আশিতে । বিক্রিও বেশ । জানা যায় গেল ষাট বছরে বাংলা অ্যাকাডেমির প্রকাশিত অভিধানের সংখ্যা ২১টি, প্রতিবেদনান্তরে ২৮টি। অ্যাকাডেমির বইয়ের বিক্রির শীর্ষে এই সব অভিধান। ২০১৬-র ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ-হওয়া ‘আধুনিক’ অভিধানটিও এর ব্যতিক্রম নয়। একুশে বইমেলা শুরুর পয়লা হপ্তায় খবরের কাগজে শিরনামা ‘দেদারসে বিকোচ্ছে অভিধান’, ‘বইমেলায় অভিধানের চাহিদা বেশি’, কিংবা ‘বিক্রির শীর্ষে অভিধান’। এর সবেতেই ‘আধুনিক’ অভিধানের বিক্রি বেশি, নতুন বলে, অ্যাকাডেমিতে ছাপা-হওয়ায় দাম কম বলে এবং, সর্বোপরি, আধুনিক বলে। বছর দুই আগে ছেপে বাজারে-আসা তিন বালামের বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক অভিধানের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকমটি ঘটেছিল: অত দামি বই, অথচ এত বিক্রি!

যাই হোক! অভিধানের বিক্রি বেশ! কিন্তু লোকে অভিধান কেনে কেন? আমজনতা অভিধান দেখে না এটা স্পষ্ট। সাধারণভাবে কাগজ-পত্রে, দোকান বা রাস্তার নামফলকে, টেলিভিশনের পর্দায় বানান এবং অর্থের যতটা ব্যত্যয় চোখে পড়ে তাতে অন্য কোন রকমের বোধ হয় না। খবরের কাগজে বা বইয়ের পাতায় বানানের যত ভুল তার সবটাই অবশ্য অভিধান না দেখার কারণে নয়; খানিকটা আমাদের জানার অভাবে আর বেশ খানিকটা ছাপাখানার ভূতের স্বভাবে। তবুও কিছু লোকে অভিধান দেখে, দায়ে প’ড়ে । অন্ন সংস্থানের জন্য চাকুরির দায়ে, আর অনেক সময় মান বাঁচাতে। কিছু লোক, সামান্য হলেও, আবার অভিধান পড়েও। প্রাণের দায়ে যারা অভিধান পড়ে, অন্তত বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে, তাদের মাঝে সেই শুরুর উইলিয়াম কেরি থেকে আজকের জামিল চৌধুরী ইস্তক সবাই আছে, সাথে আছে বেশুমার বাংলাভাষী যারা অভিধান কেনে অভিধান দেখবে বা পড়বে বলে, বাংলা ভাষাটাকে আরেকটু ভালভাবে জানবে বলে।

এই অভিধান প’ড়ো কিংবা দেখনেওয়ালাদের একদম শেষের দিকে যাদের ঠাঁই তাদের মাঝে বেশ আশা জাগিয়েছিল ‘আধুনিক’ অভিধানের প্রকাশের সংবাদ। বিশেষ প্রয়োজনের অভিধান যেমন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ভাষার অভিধান কিংবা বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দের অভিধান অথবা বানান কিংবা উচ্চারণ অভিধান বাদ দিলে, অ্যাকাডেমির বাংলা অভিধান (বাংলা-ইংরেজি কিংবা ইংরেজি-বাংলা, যে-দুটো সবচেয়ে বেশি বিকোয়, সেগুলো আদতে ইংরেজি অভিধান, ইংরেজি শেখবার অভিধান। সে কারণে এই বই দু’টিকে ডিউইর দশমিক বর্গীকরণে প্রথাগতভাবে ৪২৩·৯১৪৪ দিয়ে ইংরেজি অভিধানের সাথে রাখা হয়; যদিও ৪৯১·৪৪৩২১ দিয়ে বাংলা অভিধানের গোত্রীভূত করাও কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়) হাতে-গোনা দুটো — ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ আর (অসম্পূর্ণ) ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’। তৃতীয় ভাল কিছু একটির আশা ছিল। তবে উচ্ছ্বাস কেটে গেছে অভিধানটি হাতে নিয়েই। এমনই এদের একজন বলেছিল: ‘আধুনিক’ অভিধান দিয়ে নষ্ট করবার মত জায়গা তার বইয়ের তাকে নেই এবং ‘ব্যবহারিক’ ও ‘সমকালীন’ দুইই তার আছে। এ গল্পটি সবার হয়ত নয়; কিন্তু কারুর তো। অর্থাৎ ‘আধুনিকের’ আধুনিকতা আর ‘ব্যবহারিকের’ ব্যবহারিকতা — অভিধানে শব্দের ব্যবহার এবং বাংলাভাষী বা শিক্ষার্থীদের অভিধানটির ব্যবহার, দুই মিলিয়ে — ‘সমকালীনের’ সমকালীনতা ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।

আধুনিক বাংলা অভিধানের গায়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলি লেখা আছে তার প্রথমটি হল ‘প্রতিটি ভুক্তিই মূল ভুক্তি’, অর্থাৎ একটি শব্দ থেকে তৈরি বাকি শব্দগুলো আলাদা ভুক্তি হিসেবে দেওয়া, ইংরেজিতে যাকে denesting বলে। একই শব্দজাত প্রায় সব শব্দ, এবং অর্থের ফারাক না হলে, একসাথে জড়িয়ে না লিখে আলাদা ভুক্তি হিসেবে দেখানোর তরিকা। এই denesting বা nesting আধুনিকতা-নিরপেক্ষ। লংম্যানের সমকালীন ইংরেজি অভিধানে (Longman Dictionary of Contemporary English) ভুক্তিবিন্যাস দলমুক্ত (denested) আর অক্সফোর্ডের প্রাগ্রসর শিক্ষার্থী অভিধানে (Oxford Advanced Learner’s Dictionary) ভুক্তিবিন্যাস দলযুক্ত (nested)। দুটোই ইংরেজির বেশ আধুনিক অভিধান। অ্যাকাডেমির বাংলা অভিধানগুলোর মধ্যে কেবল বানান ও উচ্চারণ অভিধান দুটোতে ভুক্তিবিন্যাস দলমুক্ত। দলমুক্ত ভুক্তিবিন্যাসে অবশ্য শব্দ খুঁজে পাওয়া সহজ, যদিও এতে শব্দের এবং তার অর্থের আত্মীয়তা দৃশ্যত খানিকটা লোপ পায়। যাই হোক, ভুক্তিবিন্যাস দলমুক্ত না দলযুক্ত এ দিয়ে ভিন্নতা প্রকাশ পায়, আধুনিকতা নয়। কিন্তু এটি অবশ্যই একটি অভিধানের বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

অভিধানের গায়ে লেখা দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি গুরুত্বপূর্ণ — ব্যাখ্যামূলক সংজ্ঞার্থ। এপ্রিলের শুরুতে খবরের কাগজে ছাপা অভিধানকারের একটি সাক্ষাৎকারেও এ কথা স্পষ্ট। প্রথাগতভাবে বাংলা অভিধানে প্রতিশব্দ বা ব্যাখ্যা দিয়ে অর্থ বোঝানো হয়। জ্ঞানেন্দ্রমোহনে ‘আগুন’ শব্দের অর্থ ‘অনল, বহ্নি ; ক্রোধাগ্নি, উত্তাপ ; দুঃখের জ্বালা, দুরদৃষ্ট; সর্বনাশ, ধ্বংস’। হরিচরণে পাই ‘অগ্নি; (সাদৃশ্যে) তীব্র জ্বালা, সন্তাপ; (সাদৃশ্যে) প্রচণ্ড তাপ; মানসিক জ্বালা; ক্রোধে অগ্নিমূর্তি; অত্যন্ত চড়া (দর); অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,’ ইত্যাদি।‍ আধুনিক রাজশেখরে আছে ‘জ্বলা, জ্বালা, দেওয়া, ধরা, ধরানো, করা, লাগা, লাগানো, নেবা; অগ্নিপ্রায়’; অর্থ, সাথে শব্দের সহাবস্থানের (collocation) ধারণা। ‘আধুনিক বাংলা অভিধানে’ প্রতিশব্দের বদলে অনেক জায়গায় সংজ্ঞার্থ দেওয়া হয়েছে। অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী অভিধানে আগুন (fire) শব্দের অর্থ পুড়ে যাওয়ার ঘটনা যেখানে আলো এবং তাপের সৃষ্টি হয় আর তাতে প্রায়ই ধোঁয়া এবং শিখা থাকে (a process of burning that produces light and heat and often smoke and flames)। সে রাস্তা ধরে, এবং অনাবশ্যকভাবে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে, আধুনিক বাংলা অভিধানে আগুনের অর্থ ‘নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে কোনো পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট তাপ ও আলো বিকিরণকারী শিখা’। বাংলায় ও ইংরেজিতে অর্থের খানিকটা পার্থক্য আছে, তবুও ‘আধুনিকের’ সংজ্ঞার্থ বিজ্ঞান-নির্ভর এবং বিশ্বকৌষিক, আর তাই অ-সাধারণ। এ ধরণের সংজ্ঞার্থ সংজ্ঞায়নের জন্য জরুরি, পরিচয় জ্ঞাপনের জন্য নয়। আগুনের ধারণা না থাকলে, এই ব্যাখ্যা অর্থ বোঝাতে কাজে আসবে না; আর আগুনের ধারণা থাকলে, এই সংজ্ঞার্থের প্রয়োজন নেই।

অভিধানটিতে হাতির সংজ্ঞার্থ ‘বাংলাদেশ-সহ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বনাঞ্চলে দলবদ্ধ হয়ে বিচরণ করে এবং পোষ মানানো যায় এমন লম্বা শুঁড়বিশিষ্ট বিশালকায় শক্তিশালী স্তন্যপায়ী তৃণভোজী ও দীর্ঘজীবী চতুষ্পদ প্রাণী’। কিন্তু এত বড় সংজ্ঞার্থের পরও ‘হস্তী, করী, গজ’ ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে, বোধ করি, নচেৎ অন্ধের হস্তীদর্শনের অবস্থা হতে পারে। জ্ঞানেন্দ্রমোহনে পাই ‘হস্তী, করী; বৃহৎ, হাতীর মত প্রকাণ্ড’। অক্সফোর্ডে আছে মাটিতে চলে-ফেরে এমন সর্ববৃহৎ জন্তু যার দুটি বড় বাঁকানো দাঁত, মোটা চামড়া, ও একটি লম্বা শুঁড় আছে (the largest land animal now living, with two curved tusks, thick skin and a long trunk)। ‘আধুনিকে’ মাছরাঙার সংজ্ঞার্থ ‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে জলাশয়ের ওপর নিশ্চল হয়ে শূন্যে ভেসে থেকে শিকারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার পর জলে ঝাঁপ দিয়ে শিকার তুলে আনে, এমন বড় মাথাওয়ালা বিচিত্র বর্ণের উজ্জ্বল পালকবিশিষ্ট পাখি’। জ্ঞানেন্দ্রমোহনে ‘মৎস্যখাদক পক্ষিবিশেষ’, হরিচরণে ‘মৎসজীবী পাখীবিশেষ’ আর রাজশেখরে ‘মৎস্যরঙ্গ পাখি বিশেষ’; এর প্রতিটিতেই ইংরেজিতে kingfisher শব্দটি লেখা আছে। অক্সফোর্ডে আছে ঊজ্জ্বল রঙের একটি ছোট পাখি যা লম্বা বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে নদীতে মাছ ধরে (a small bird with bright colours and a long beak, which catches fish in rivers, etc)। আবারও সেই কথা, চক্ষুচর্মে না দেখলে, তা সংজ্ঞার্থই হোক, যত বড়ই হোক, বা প্রতিশব্দ কোনও কাজে আসে না; অভিজ্ঞান অভিধা-ভিত্তিক নয় যে। সংজ্ঞার্থের এই বহর দেখে মনে হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয় ভাষার অভিধানটা বিজ্ঞানকোষ কিংবা বিশ্বকোষ হতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাভাষীরা একটি ভাল অভিধান চায়।

ভুক্তির দলমুক্ত বিন্যাস আর সংজ্ঞার্থের ব্যস্ততায় হাত গলে যে বিষয়টা সাধারণভাবে বেরিয়ে গেছে তা হল শব্দের অর্থের রঙ এবং বর্ণ। প্রধান বা মূল সংজ্ঞার্থের (primary definition) বাইরেও শব্দের অর্থ থাকে, যেমন গৌণ অর্থ (secondary definition); আবার নির্দেশিত অর্থের (denotation) বাইরে অনির্দেশিত অর্থও (connotation) রয়েছে। মূল এবং গৌণ অর্থের সমাধান দলমুক্ত ভুক্তির মাথায় সংখ্যা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য বোঝানো যায় এবং আধুনিক বাংলা অভিধানে তা করাও হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন আর হরিচরণে ‘আগুনের’ এতগুলো অর্থ আধুনিক বাংলা অভিধানে মোটামুটিভাবে হাপিস। লোকটি রেগে আগুন, ক্ষিদেয় পেটে আগুন, কথা শুনে শরীরে আগুন ধরে গেল, জ্বরে শরীর যেন আগুন, অজন্মায় চালের বাজারে আগুন, কপালের আগুন আর নেভে না, কিংবা আগুনের কপালে আগুন এসব বাক্য কিংবা বাক্যাংশের প্রথমটিতে ছাড়া আগুন শব্দের প্রয়োগ ঠিক আছে কি না তা অন্তত আধুনিক বাংলা অভিধান দেখে বোঝা যায় না; কারণ এখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে কোনো পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় না।

অভিধানের গায়ে লেখা তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল — প্রতিটি ভুক্তির উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তি। উচ্চারণের বিচারে আধুনিক বাংলা অভিধান একটি গতানুগতিক প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালায় উচ্চারণ দেওয়া থাকলে পড়তে সুবিধা হত বেশ। উচ্চারণ লেখবার এই ফন্টটা বিনে পয়সায় ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে নেওয়া যায়। যাই হোক, অভিধানটিতে দেওয়া উচ্চারণ দেখে ধারণা করা যায় এর উদ্দেশ্য উচ্চারণের শাসন, অর্থাৎ আনুশাসনিক (prescriptive); বর্ণনামূলক (descriptive) নয়। ‘গর্দভ’ শব্দটির উচ্চারণ বেশিরভাগ বাঙালির বুলিতে ‘গর্‌ধোব‍্’; সচেষ্ট উচ্চারণে খুব বেশি হলে ‘গর‍্‌দোব‍্’ হতে পারে; শব্দান্ত্য মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি হলন্ত হলে মহাপ্রাণতা হারায়। কিন্তু ‘গর্‌দোভ‍্’ কদাচ নয়; অথচ এরকমটি দেওয়া আছে আধুনিক বাংলা অভিধানে। আরবির তিন আসর বাংলার ভাঁড়ারে বিদ্যমান। বৈঠক অর্থে আসরের (আইন-শিন-রা) উচ্চারণ ‘আশোর‍্‌’; লোকের বুলিতে এবং আধুনিক বাংলা অভিধান সমেত প্রায় সব অভিধানে। হুতোম প্যাঁচার নকশায় বানানটি অবশ্য ‘আসোর’। প্রভাব অর্থে আসরের (আলিফ-সা-রা) উচ্চারণ আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘আসর‍্’, অঘোষ দন্তমূলীয় উষ্ম ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে, যেটা শুনতে ইংরেজির s-এর মত, আর স্বরধ্বনিটা বাংলার অুনসর্গ ‘অ’-এর মত, ও-নয়। চলতি বাংলায় বানানটা ‘আছর’ এবং উচ্চারণ হামেশা ‘আছোর‍্’। ‘আজকালকার দিনে লোকজনের ওপর জিন-ভুতের সেই রকম আছর হয় না’। মজার ব্যাপার হল ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে আছর পাওয়া গেলেও আধুনিক বাংলা অভিধানে এর দেখা মেলে না। অপরাহ্ণ, অপরাহ্ণের নামাজ বিশেষ অর্থে আসর (আইন-সোয়াদ-রা)। ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহনেও আছে; ব্যবহারিক অভিধানে উচ্চারণ ‘আসর‍্’, ইংরেজির s-ধ্বনি আর অুনসর্গ ‘অ’, এবং, আবারও, ও-নয়; আধুনিক বাংলা অভিধানেও তাই। জ্ঞানেন্দ্রমোহনের ‘আশোর‍্’ আছে অনেকের মুখের বুলিতে। আমরা সাধারণভাবে জানি যে বাংলায় শিস‍্‌ধ্বনি একটি, ঠিক যেমনটি ‘সবিশেষে’। আওয়ামি বুলির শ্যামবাজারের শ হোক কিংবা ‘স্যামবাজারের সসীবাবুর স’,  ধ্বনিমূল কিন্তু একটিই — অর্থাৎ আমজনতার শ, তবে সহধ্বনি সমেত, অর্থাৎ সসীবাবুর স, যেটা আদতে ইংরেজির s-ধ্বনি। দুটোর মাঝে সম্পর্ক পরিপূরক বিন্যাসের: উষ্মধ্বনিটি সাধারণভাবে শ, দন্তমূলীয় উষ্ম ব্যঞ্জনধ্বনি; কিন্তু এই শিস‍্-ধ্বনিটির পরে ত, থ, ন, র, এবং ল এলে উচ্চারণটি সসীবাবুর স, উত্তর-দন্তমূলীয় উষ্ম ব্যঞ্জনধ্বনি।

বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রে আধুনিক বাংলা অভিধানের সবচেয়ে বড়, এবং বাড়াবাড়ি রকমের বড়, অবদান হল বিদেশি ধ্বনি, সাথে শব্দের, আমদানি। বিদেশি, বিশেষত ইংরেজি, শব্দের সাথে এসেছে বিদেশি উচ্চারণ, শিক্ষিতের বুকনি হিসেবে, অনেকটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে এবং বাংলার নিজস্ব ধ্বনি-ভাণ্ডার এবং ধ্বনি পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে। ইংরেজির s-ধ্বনি, অর্থাৎ সসীবাবুর স, বাংলায় স্বমহিমায় ধ্বনিমূল কি না তা নিয়ে বিতর্ক অনেক। আস্তে আস্তে আসতে গিয়ে অনেকটা দেরি হয়ে গেল — এতে কোনটা কেন আম বাঙালির শ আর কোনটা কেন সসীবাবুর স সে তর্কে না গিয়েও আমরা জানি বিদেশি শব্দে স মানেই ইংরেজির s-ধ্বনি। কিন্তু সমস্যা হল সুনীতিকুমারের ভাষায় যেগুলো অনত্যাবশ্যকীয় ধ্বনি সেগুলো নিয়ে। বাংলার ফ এবং ভ দ্বি-ঔষ্ঠ্য স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনের মহাপ্রাণিত রূপ — ওপর এবং নিচের ঠোঁট চেপে ধরে হ-যোগে উচ্চারিত। কিন্তু ইংরেজিতে f-ধ্বনি এবং v-ধ্বনির পরিচয় হল এগুলো ওষ্ঠ-দন্ত্য উষ্ম ধ্বনি — নিচের ঠোঁট ওপরের দাঁতের সাথে আলতোভাবে লেগে বাতাস ঘষা খেয়ে বের হয়। বাংলায় এ ধরনের ধ্বনি প্রকাশের হরফ নেই বলে ফ এবং ভ দিয়ে লেখা হয়; উচ্চারণও সে মোতাবেক — আম বাঙালির বুলিতে বাংলার ফ আর ইংরেজি কিংবা আরবি-ফারসি-জানা আশরাফ জবানে ইংরেজির f-ধ্বনি, বানানে ফ হলেও ; v-ধ্বনির ক্ষেত্রেও তাই। দফারফা (দুটো ফ-ই), ফজলি আম, ফতুয়া, ফতুর, কেল্লাফতে, ফতোয়া, ফরমায়েশ, ফরাসি, ফাইল, ফানা, ফায়দা, ফারাক যেগুলো বাঙালির বুলিতে স্পৃষ্ট ধ্বনি, আধুনিক বাংলা অভিধানে সেগুলো সব উষ্ম ধ্বনি। বাংলার সাপেক্ষে এই বিদেশি ধ্বনি লেখবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ফুটকি-ফ, মানে ফ-এর নিচে ফুটকি বা বিন্দু — ডাকটা অনেকটা হাঁটু-ভাঙ্গা দ কিংবা পেট-কাটা মুর্ধণ্য ষ-এর ছাঁদের। বাংলার এতটা পথ পেরুনোর পর স্বকীয়তা পালটে হঠাৎ অনত্যাবশ্যকীয় কিংবা যা কেবল আশরাফ জবানে পাওয়া যায় এমন ধ্বনিকে মেনে নিতে হবে কেন? বাংলা ভাষার ধ্বনির ভাঁড়ারে এতদিন যা মেহমান, হঠাৎ করে কেনই বা তা ঘরের লোক? বাংলা শব্দের ভাণ্ডারে ইংরেজির উপস্থিতি আরবি-ফারসির মত এতটা প্রবল এবং আত্মিক নয়। আর ইংরেজি v-ধ্বনির কিছু শব্দ বাংলায় ভ-ধ্বনির পরিচয়ে এতদিন চলে এসেছে। এগুলোও আধুনিক বাংলা অভিধানে ফুটকি-ভ, মানে ইংরাজির v-ধ্বনি, টেলিভিশনে যেমন। ভাষার আঞ্চলিকতার প্রভাবে এবং দায়-সারা গোছের উচ্চারণের কারণে (শিক্ষা-পদ্ধতির গলদ কি?) এমনিতেই কয়দিন পর হয়ত বাংলা ফ-ধ্বনি এবং ভ-ধ্বনির শোকগাথা লিখতে বসতে হবে! এদিকে আবার f-ধ্বনি এবং v-ধ্বনির দুই তুতো ভাই, দ্বি-ঔষ্ঠ্য নৈকট্যক, ঠিক জাপানি ভাষায় ফু যেভাবে উচ্চারিত এবং একই তরিকায় ভু উচ্চারণ করলে যা হয়, তা জেঁকে বসতে শুরু করেছে। ধ্বনি দুটোর কথা সুনীতিকুমারের আলোচনায় ছিল; কিন্তু তা বড় তাদাদে দৃশ্যমান হচ্ছে।


এরকম আরেকটি বাংলায় অনত্যাবশ্যকীয় ব্যঞ্জনধ্বনি হল ঘোষ দন্তমূলীয় উষ্মধ্বনি, ইংরেজির z-ধ্বনি। লেখা হয় ফুটকি-জ দিয়ে। ফুটকি যোগে হরফের পরিবর্ধন অনেক ভাষাতেই হয়; বাংলায়ও নতুন নয়। ১৮৫১ সালে ছাপানো জন মেন্ডিসের কম্প্যানিঅন টু জনসন্‌’স ডিকশনারি: বেঙ্গলি অ্যান্ড ইংলিশ-এ বর্গ্য জ-এর নিচে দুই ফুটকি দেখতে পাওয়া যায় ইংরেজির z-ধ্বনি বা আরবি-ফারসির জাল-, জা-, জোয়াদ বা জোয়া-ধ্বনির জন্য। অভিধানকার বা ভাষাবিজ্ঞানীদের হাত ধরে নিচে-ফুটকি বা পাশে-ফুটকি (সুনীতিকুমারে যেমনটি দেখা যায়) জ-এর ব্যবহার z-ধ্বনির জন্য; নিচে-দুই-ফুটকি জ-এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় বুদ্ধদেব বসুর লেখায়, রুশ ভাষায় জীবনের যে জিজ‍্ন‍্ তার প্রথম ব্যঞ্জনে। যাই হোক, জবেহ, জর্দা, শাহজাদা, জানাজা (শেষের জ), জায়নামাজ (শেষের জ), রুশ জার, জালিম, জিকির, জিদ, জিন্দা এবং জিন্দাবাদ, জেদ, জেনানা যেগুলো আম বাঙালির বুলিতে জ-ধ্বনি, আধুনিক বাংলা অভিধানে সেগুলো সব z-ধ্বনি। আর এই ফাঁকে অভিধানের গায়ে লেখা তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি মেনে পুরস্কার অর্থে ইংরেজি প্রাইজ (ফুটকি-জ দিয়ে) শব্দটি অভিধানে ঢুকে প’ড়ে বাংলার সম্পত্তি হয়ে দাঁড়াল। বহুল ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের আলাদা অভিধান হতে পারে, আছেও। কিন্তু তাই বলে বাঙালির জবানে উঠে-আসা তাবৎ বিদেশি শব্দকে ঠাঁই দিতে হবে বাংলা অভিধানে? সেলফি, সিমকার্ড এসে গেছে; সাথে এসেছে সেলফির বাংলা, নিজস্বী, আলাদা ভুক্তি হিসেবে। সেলফি তুলছি কয়েক বছর ধরে, এটি অভিধানটিতে আছে; অথচ ব্যাংক ড্রাফট করছি সেই কবে থেকে, কিন্তু অভিধানটিতে খুঁজে পাচ্ছি না। স্বরের হ্রস্বতা-দীর্ঘতা বাংলার ধ্বনিমূলক (phonemic) বৈশিষ্ট্য নয়; বরং ব্যাপারটা উচ্চারণগত (phonological)। কিন্তু ‘আধুনিক’ অভিধানে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি শব্দে স্বরের দীর্ঘতা নির্দেশে আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালার দীর্ঘতা-নির্দেশক সেমিকোলনের মত দেখতে চিহ্নটির ব্যবহার হয়েছে — যেমন, ইংরেজি এবং আরবির জিনের উচ্চারণ ‘জি:ন’, কিংবা বাংলা গম ‘গ:ম’ বা খেপ ‘খে:প’। স্বরের হ্রস্বতা-দীর্ঘতা নেই বলেই বাংলায় বিদেশি শব্দের বানানে দীর্ঘ স্বরের ব্যবহার হয় না। কিন্তু ফিরে এল বলে। একটা সুবিধে বরং হবে: সংস্কৃতের মন্দাক্রান্তা ছন্দে দুয়েকটি কবিতা লেখা যাবে।

উচ্চারণে বা বানানে বিকল্প-বর্জনের ব্যাপারটি আধুনিক বাংলা অভিধানে বেশ স্পষ্ট এবং সে কারণে অভিধানটি আনুশাসনিক বা উপদেশমূলক, যা আধুনিকতার লক্ষণ নয় মোটেও। বিদেশি তিন ব্যঞ্জনধ্বনির (f-ধ্বনি, v-ধ্বনি, এবং z-ধ্বনি) ও স্বরধ্বনির দীর্ঘতা আমদানি ছাড়াও, অভিধানটিতে বানান ও উচ্চারণভেদ নিয়ে সমস্যা প্রকট। জিহ্বা বা আহ্বানের হ্ব-এর উচ্চারণ হয় উভা-ওভা (জিউভা বা আওভান) নয় ব‍্ভা (জিব‍্ভা বা আব‍্ভান)। ‘আধুনিকে’ কেবল উভা-ওভা, তাও ফুটকি-ভ দিয়ে। বাংলায় -ইবা (চলিত রীতিতে -বা) প্রত্যয় যোগে ক্রিয়া-বাচক বিশেষ্য পদ যা ‘মাত্র’-যোগে এবং চতুর্থী ও ষষ্ঠী বিভক্তিতে ব্যবহৃত হয় – করিবা-মাত্র, করিবার এবং করিবার জন্য, তার চলতি রূপ (করিবার > কইর‌বার >) ‘করবারের’ উচ্চারণ অনুসর্গ-অ দিয়ে কর‍্‌বার‍্, যদিও কোর‍্‌বা‍র‍্ উচ্চারণটি যথেষ্ট চালু, পূর্ববঙ্গীয় বুলিতে তো বটেই। করবার ছাড়া অন্য কোনও ক্রিয়া-বাচক বিশেষ্য পদ ‘আধুনিকে’ চোখে পড়ল না; কিন্তু ‘কর‍্‌বার‍্’ থেকে অনুমান করা যায় ধরবার (ধর‍্‌বার‍্), গোনবার (গোন‍্‌বার‍্), দেখবার (দ্যাখ‍্‌বার‍্), শোনবার (শোন‍্‌বার‍্) বা খেলবার (খ্যাল‍্‌বার‍্) এমনটাই হবে; ধোর‍্‌বার‍্, গুন‍্‌বার‍্, দেখ‍্‌বার‍্, শুন‍্‌বার‍্ বা খেল‍্‌বার‍্ নয়। সাধু ভাষার উচ্চবংশীয় স্বরধ্বনি (ও, এ আর উ) তার ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের জন্য হার-নিশ্চিত-জেনেও চলিত ভাষার নিম্নবংশীয় স্বরধ্বনির (অ, অ্যা আর ও) বিরুদ্ধে যে লড়াই তার কোনও ছাপ রইল না।

কারুর পরিচয় জিজ্ঞেস করলে উত্তরে সাধারণত নাম, বড় জোর পেশা বলাই রীতি। দাদা-ঠাকুরদাদার নাম, সাকিন, মোকাম, বয়স, উচ্চতা কিংবা ওজন বলা হয় না যেমনটা বলবার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় আধুনিক বাংলা অভিধানের সংজ্ঞার্থগুলোতে। অথচ ব্যুৎপত্তি যেখানে ঠিকুজি-কুলজীর পুরোটাই বলতে হয় সেখানে বেশিরভাগ ভুক্তির ক্ষেত্রে কেবল একটি ভাষার নাম, সংক্ষেপে, যেমন স., মানে সংস্কৃত, কিংবা আ., মানে আরবি। বাংলায় বানানে অবিকৃত সংস্কৃত শব্দ কিভাবে নিষ্পন্ন হয়েছে, সংস্কৃতের যেসব শব্দ বিভিন্ন জায়গায় হোঁচট খেয়ে বাংলায় ঢুকেছে তাদের আদিরূপ আর দুয়েক জায়গায় কাছাকাছি ধরনের কয়েকটি ব্যুৎপত্তি; বাকি সব উৎপত্তি। বিভিন্ন ধাপে শব্দের রূপ কি ছিল, তার মানে কিভাবে পালটেছিল তার বর্ণনা অনুপস্থিত। করুণভাবে আরও অনুপস্থিত ব্যাখ্যা-উদ্ধৃতি, বানানো হোক বা সাহিত্য থেকে তুলে আনা। শব্দের অর্থ বোঝাতে ব্যাখ্যা-উদ্ধৃতির জুড়ি নেই।

অভিধানকারের সাক্ষাৎকারে বিকল্প বানান নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর ছিল: ‘অভিধানে বিকল্প বানান আমরা রাখিনি। আমাদের নীতিগতভাবেই সিদ্ধান্ত ছিল, বিকল্প বানান আমরা রাখব না।’ অভিধানের ভেতরে অবশ্য একাডেমি (বইয়ের নামে এই বানান), অ্যাকাডেমি (বানানের নিয়মে এই বানান) এবং আকাদেমি (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির নামে এই বানান) তিনটি বানানভেদ বিদ্যমান। একটি ভাল অভিধানে বানানভেদের রকমফের থাকবারই কথা। ওদিকে জেদ বা জেদিকে প্রধান ভুক্তি না দেখিয়ে জিদ বা জিদিকে মূল ভুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে; এর অর্থ হল হয় জিদ বা জিদি বেশি প্রচলিত, মান্য বাংলার হিসেবে যা ঠিক নয়, নাহয় অভিধানকারের মতে জিদ বা জিদিই ব্যবহার করা উচিত, সেটা আবার আনুশাসনিক হয়ে পড়ে। গ্রেফতার, দফতর, রফতানির ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার, দপ্তর, রপ্তানি রাখা হয়েছে বটে কিন্ত ঊষা-উষার মধ্যে বিকল্প-বর্জনের কারণে উষা আর শ্রেণী-শ্রেণির মধ্যে শ্রেণি রাখা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় স্বরের বিকল্পটাই ধর্তব্য, ব্যঞ্জনেরটা নয়। ওদিকে আবার ঈদ-ইদ দুটিই আছে। স্বরের বিকল্পে বানানের নিয়মে হ্রস্ব স্বরের ব্যবহারটাই দুরস্ত; কিন্তু বানানে দীর্ঘ স্বরকে অন্তত অভিধান থেকে নির্বাসন দিলে সাহিত্যের অনেক কিছুকেই ভুলের তকমা দিতে হয়।

বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘পরিবহন’ শব্দের বিকল্প বানান ‘পরিবহণ’ দেওয়া আছে। ভুক্তি একটিই, কিন্তু প্রথমে পরিবহন; অর্থাৎ পরিবহণের দেখাও মেলে তবে পরিবহনের চেয়ে কম। শব্দসঞ্চয়িতা বাংলা অভিধানে পরিবহন(ণ), অর্থাৎ ন-এর ব্যবহার বেশি। ব্যাকরণের দিক থেকে বিকল্প কেন তা বোঝা বেশ কষ্টকর; তবে ভুল বানানের ভূয়োব্যবহার থেকে এক ধরনের মান্যতা আসে, সে বিচারে ণ-এর বানানটা বিকল্পে থাকতেই পারে। পরিবহন শব্দটি সাধারণ তৎসম শব্দ থেকে আলাদা। শব্দটি হরিচরণে নেই। যোগেশচন্দ্রেও অনুপস্থিত। নির্বিকল্প দন্ত্য-ন কেবল জ্ঞানেন্দ্রমোহন, রাজশেখর আর পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বিদ্যার্থী অভিধানে। বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান, আকাদেমি বানান অভিধান আর সংসদ বানান অভিধানে নির্বিকল্প মূর্ধণ্য-ণ। বোধ করি পরিভাষা হিসেবে পরিবহনের জন্ম, পরে সাধারণ শব্দভাণ্ডারের অংশ হয়ে যায়; হিন্দিতেও, বানানটিও একই, তবে হিন্দি বলে, অন্তস্থ-বটি চোখে পড়ে। পরি পূর্বক বহ‍্ ধাতু যোগ অন‍্ (অনট‍্) প্রত্যয়। সংস্কৃতে একটি নিয়মে আছে: প্র, পরা, পরি, নির্ — এই চারি উপসর্গের ও অন্তর শব্দের পরে-স্থিত নদ্, নম্, নশ্, নহ্, নী, নুদ্, অন্, হন্, এই কয়টি ধাতুর দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয়। আরেকটি নিয়ম হল: ঋ, র, ষ এর পরে যদি ক-বর্গ অথবা প-বর্গ অথবা য, য়, হ, প্রভৃতি অক্ষরের যে কোন একটি বা দুইটি অক্ষর আসে, তবে তার পরে মূর্ধন্য-ণ হবে। পরিবহনে ধাতুটি হল বহ‍্ আর ব-টি হল অন্তস্থ। তাছাড়া ণ-ন দুটিই ঠিক হলে দন্ত্য-ন নেওয়াই বুদ্ধির কাজ; উষা-ঊষা, ধরণি-ধরণী বা ধূলি-ধূলীর ক্ষেত্রে যেমন। বাংলা অ্যাকাডেমির বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে শব্দটি নেই; ব্যবহারিকে দন্ত্য ন-এর মূল ভুক্তি থেকে সরে এসে মূর্ধন্য ণ-এর মূল ভুক্তির কারণটি কি?

‘আধুনিক’ অভিধানকারের মতে যুক্তবর্ণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ লিপির ব্যবহার অভিধানটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বাংলা লিপিতে যুক্তবর্ণের স্বচ্ছতার দাবি এবং স্বচ্ছ অবয়বে লেখা বা ছাপা অনেক পুরানো ব্যাপার। সীসার বিচল হরফের সময় একপ্রস্থ ফন্টে সর্ট বা সাটের সংখ্যা ছিল সাড়ে আটশ’র বেশি। লাইনোটাইপ-মোনোটাইপ আসাতে কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে হরফের রূপ সরল হতে শুরু করেছিল, যদিও সবসময় দেখতে সুন্দর হচ্ছিল না। বাংলায় মুদ্রাক্ষর যন্ত্র আসার পর সবচেয়ে বেশি সরল হয়েছিল লেখা, বিশেষত যুক্তবর্ণ, সবচেয়ে বদখতও। কম্পিউটারে এসে আবার পিছুটানে পিছিয়ে পড়া; এবং আমরা কাজে পেরে না উঠলেও, তাত্ত্বিকভাবে পিছিয়ে গেছি যতটা সম্ভব ইউনিকোডে বাংলা আসার পর। কারণ মূলত দুটো — সবসময় আমাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রাপ্ত কারিগরি সুবিধার মধ্যে কি করে বাংলা লিখতে পারা যায়; আর কম্পিউটারে ফন্ট তৈরি এখানে সাধারণত হয়েছে লিপিকৌশলের জ্ঞানের বাইরে থেকে; অবস্থা একটু পালটাতে শুরু করেছে অবশ্য।

অভিধানকারের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় অভিধানটিতে ‘রেফটা একটু বাঁদিকে’ আর ‘চন্দ্রবিন্দুটা একটু ডানদিকে’। কারণ ‘আগে তো আমরা “র” উচ্চারণ করি; তারপর বর্ণটা’ এবং চন্দ্রবিন্দু ‘অনুনাসিক ধ্বনির প্রতীকরূপে কেবল স্বরবর্ণ বা স্বরের সঙ্গে যুক্ত হয় এমন বর্ণ’। দ্বিতীয় সংস্করণ যেটি এপ্রিলে বেরিয়েছে তাতে এমনই আছে। বাংলা হরফে বর্ণাশ্রয়ী রেফ এবং চন্দ্রবিন্দু প্রথাগতভাবে মূল হরফের মাত্রার ওপরে মাঝখানে বসে; মূল হরফে খাড়া দণ্ড থাকলে যেমন ক, ধ, গ, শ ইত্যাদি অথবা আ-কার বা ও-কার থাকলে দণ্ডের ওপরও বসে; ই-কার, ঈ-কার বা ঔ-কার থাকলে একটু ডানে সরে বসে যেন দেখতে জড়ানো মনে না হয়। টিকিওয়ালা হরফ যেমন ই, ঈ, উ বা ট-এর ক্ষেত্রেও একটু ডানে সরে বসে। আদতে ব্যাপারটা ছিল সুবিধে-অসুবিধের; ছাপাখানার আঘাত সামলাতে যেখানে দেবার দরকার সেভাবে ঢালাই করা হত। বাংলা ছাপার শুরুর দিকে চন্দ্রবিন্দু অনেক সময় আলাদা বসত; লাইনো-মোনো আসার পর রেফ এবং চন্দ্রবিন্দু দুটোই আলাদা বসত। ওদিকে জ্ঞানেন্দ্রমোহনে যদিও নিচে-ফুটকি হরফ দেখতে পাই, সুনীতিকুমারে পার্শ্ব-ফুটকি হরফের অভাব নেই। তারপরও বাংলাদেশে অভিধানে অন্তত সহজ-সরল যুক্তবর্ণ ব্যবহারের জন্য ধন্যবাদের দাবিদার। কিন্তু যুক্তবর্ণের সরলতা সত্ত্বেও লিপিকৌশলের বিচারে ১৯৮৪ সালে তৈরি এই ফন্টটি মোটেও দৃষ্টিনন্দন নয়, বরং খানিকটা পীড়াদায়ক। ল-এ ম, ল-এ ক, ক্ষ-এ ম কোথাও ঝোলেনি বটে, কিন্তু শ-এ র, সাথে উ-কার, দেখে মনে হয় শ র-ফলা পড়লেই রণপা পড়েছে। ক্ষ (ক্+ষ) ভেঙ্গে সরল কিছু করা যায় কি না তা দেখার সুযোগ হল না, কিন্তু ষ্ণ (ষ্+ণ) ভেঙ্গে যা হয় তা আমরা দেখেছি, ছাপায় এবং পুথিতে; ‘আধুনিকে’ তার দেখা মেলে না। সংজ্ঞার হরফে টানের মোটা বা চিকন যতটা চোখে পড়ে, সংজ্ঞার্থে ততটা নয়; কারণ ফন্টের সমস্যা। সংজ্ঞার্থের হরফে টান বা দাগগুলো আরেকটু মোটা আর আনুপাতিকভাবে পাশে আরেকটু, এত সামান্য যে খালি চোখে ধরা পড়ে না এমনভাবে, ছড়িয়ে থাকলে পড়তে সুবিধে হত। ণ-এ ড মোটেও দেখতে সুন্দর হয়নি; একই অবস্থা ন-এ থ এবং ন-এ ধ এর ক্ষেত্রেও। হসন্ত বা হলন্ত যাই বলি না কেন দেখতে এত ছোট যে চিহ্নটা নিজে নিজে চোখে পড়ে না; বরং চোখ দিয়ে একে খুঁজে নিতে হয়। রোমক হরফের যেমন ভূমিরেখা, বা baseline, বাংলা হরফের তেমন শিরোরেখা; রোমক হরফের ক্ষেত্রে ভুঁই ফুড়ে হরফ ওঠে; বাংলা হরফের ক্ষেত্রে হরফ শিরোরেখা ধরে ঝুলে থাকে। ‘আধুনিকের’ ফন্টে হরফচিহ্নগুলোর (glyph) প্রতিবেশিক দূরত্ব (লিপিকৌশলের পরিভাষায় যাকে side bearing বলে) দেখতে সমান নয় আর তাই দেখতে অসুবিধে হয়। হরফের ছাঁদ বৈচিত্র্যে ছাপার যে শিল্প হয় তা অনুপস্থিত। ইংরেজিতে বাংলা হরফ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা বিদ্যাসাগর, সুকুমার রায়, সুরেশচন্দ্র মজুমদার আর হাল আমলে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কার্যত এবং অকার্যত বাকি কেউ করেনি; তবে করবার সময় হয়েছে।

সব হিসেব-নিকেশের পর হাতে সেই দুই — ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ আর ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’। বাংলা অ্যাকাডেমির প্রথম অভিধান — ‘পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ — ১৯৬৫ সালে ছাপানো, তিন খণ্ডে। দুই খণ্ডে দ্বিতীয় সংস্করণ ছেপে বেরোয় ১৯৭৩ সালে, নাম পালটে, ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ হিসেবে; অখণ্ড তৃতীয় সংস্করণ বেরোয় ১৯৯৩ সালে। তবে প্রথম সংস্করণের থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণের কোনও পার্থক্য নেই। আঞ্চলিক ভাষার অভিধানটি ১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া ‘পূর্ব পাকিস্তানি বাংলার আদর্শ অভিধান’ প্রকল্পের প্রথম অভিধান। দ্বিতীয় অভিধানটি হল ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ — স্বরবর্ণ খণ্ড ছাপা হয় ১৯৭৪ সালে; ব্যঞ্জনবর্ণ খণ্ড ছাপা হয় ১৯৮৪ সালে; তখন অবশ্য নাম ছিল ‘বাংলাদেশের ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’। অখণ্ড সংস্করণ ১৯৯২ সালে, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান নামে ; এবং পরিমার্জিত সংস্করণ ২০০০ সালে। বিশেষ আঞ্চলিক ভাষার অভিধানের কথা বাদ দিলে, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান আর সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান — যার স্বরবর্ণ খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে আর ক–ঞ খণ্ড ১৯৯৮ সালে। এ দুটোই বাংলা অ্যাকাডেমির অভিধান বাবদে গর্বের ব্যাপার। খবরের কাগজে লেখাজোকা থেকে জানা যায় ‘সমকালীনের’ তথ্য-উপাত্ত কিংবা শব্দ এবং ব্যাখ্যা-উদ্ধৃতি সংগ্রহটি বহাল তবিয়তে আছে। অসমাপ্ত এই কাজটির সমাপ্তি ঘটানোর চেষ্টা করা যায় না? বলা হয় ‘ব্যবহারিকের’ বর্তমান ভুক্তির সংখ্যা ৩২,০০০-র বেশি ; ভুক্তি-উপভুক্তি মিলিয়ে ৭৩,০০০-র বেশি। ‘আধুনিকের’ অভিধানকারের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় অ্যাকাডেমি ‘ব্যবহারিকের’ সংস্করণে (সাক্ষাৎকারে যদিও বলা ছিল সংস্কার) আগ্রহী। সে কাজটিই হোক ; ভালভাবে হোক।

 

আবু জার মোঃ আককাস। (১৮–১৯শে ডিসেম্বর ২০১৬)। ‘আধুনিক’ অভিধানের আধুনিকতা। বণিক বার্তা। দুই কিস্তিতে ছাপানো।

 

Rev.: vii·xi·mmxxii